আমি তিন সন্তানের মা।
আমার এক মেয়ে, দুই ছেলে। প্রথম মা হয়েছি ১৬ বছর বয়সে। বাবার সমস্যার জন্য তারাতারী বিয়ে দেয়া। যখন নিজেকে সামলাতে পারার মত বয়স নয়, তখনই আমায় সংসার, স্বামী , সন্তান সামলাতে হয়েছে। আমায় কেউ তেমন একটা সাহায্য করেনাই। সেই বয়স থেকেই আমি সন্তানের পড়াশুনা করার চিন্তা থেকে স্বামীকে চাপ সৃষ্টি করে টাকা জমিয়ে রাখা শুরু করেছি। খুব ভোরে উঠে স্বামীর জন্য খাবার, টেবিলে গুছিয়ে প্রথম সন্তানকে জামাকাপড় পড়িয়ে, স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে, আরেকটা বাচ্চাকে কাপড় পড়িয়ে, ওর কাথা, খাবার ব্যাগে নিয়ে,আমি নিজেকে কখনো গুছাতে পেরেছি কখনো পারিনাই পৌনে সাতটার স্কুল ধরেছি।
অনেকের ধারনা, আমি আদর্শ মা নই। ওদের ছাড়া কখনোই কোথাও কিছুই খাইনা, ঘুরতেও যাইনা, তারপরও আমি আদর্শ মা নই। বাবার পরিবারে মেয়ে বলে আমি স্বাধিনতা পাইনি, ভেবেছি বিয়ের পরে পাবো। স্বামীর অসহযোগীতায়, বাধায় আর কটু কথায় মার খেয়ে যখন অন্য মেয়েরা ডিপ্রেশনে ভূগে নির্ঘুম রাত কেদেঁ ভাসায়! সেখানে আমি চোখের পানি মুছে এইচ এসসি, বি এস এস, এম এ রাত জেগে বই ও এসাইন্টমেন্ট লিখেছি। ভালোভাবে কিছুই করতে পারিনাই কারন আমি স্বাবলম্বী ছিলাম না। অর্থ আর মানসিক জোর দুটোই জরুরী জীবনে উন্নতির জন্য। আমি এমন একটা মানুষ থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও আর বেশী এগিয়ে যাই , এটাই আমি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এমফিল, পিএইচডি করতে গিয়েছি ডিগ্রীর পয়েন্ট কম বলে করতে পারিনাই। জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ ভার্সিটিতে চেষ্টা করবো। তাও না হলে ইন্ডিয়া যেয়ে করবো ইনশাআল্লাহ । এখন এল, এল বি করছি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
মাতৃত্ব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু সবকিছু নয়। মাতৃত্বে জীবনের সব পূর্ণতা খোঁজে যে নারী বার্ধক্য জীবনে সে একা। সন্তানের বিয়ে, উচ্চ শিক্ষা বা দূরত্বের কারনে সেই মা ভোগে হতাশায় বা আর্থিক ও মানসিক অনিশ্চয়তায়। কখনো ও ছেলেমেয়ের সংসারে নাক গলিয়ে হয় খারাপ শাশুড়ি । অথবা ছেলে বৌ বা মেয়ে জামাইয়ের কাছে হয় অপমানিত। আমি কারো কাছে অপমানিত হতে চাইনা বলে যেমনই হোক একটা চাকরী নিয়ে নিয়েছি। তাই নিজস্বতায় আমি আর আপোষ করতে চাইনি। তারমানে এই নয় যে আমি আমার সন্তানদের ভালবাসি না। হয়তো তথাকথিত আদর্শ মা নই
নিজেকে সন্তানের উপর নির্ভরশীল দেখতে চাইনা। তাদের বিবাহিত জীবন বা দূরে যাওয়া নিয়া হতাশায় ভূগতে চাইনা। বার্ধক্য বা বাকি জীবন জীবন নিজ ক্যারিয়ার, ব্যবসা, সমাজসেবা করে কাটাতে চাই । নিজ জগতে স্বাধীনভাবে বিচরন করতে চাই। ঘরে ঘরে আমার মত নিষ্ঠুর মা তৈরী হয় যেনো, সেই উৎসাহ দিতে চাই। পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের মাথা উঁচু করে বাচঁতে শেখাতে চাই। । এই সমাজের অনেকের ধারনা আদর্শ মা হতে হলে শখ, আহ্লাদ রাখা যাবেনা, আমি তাদের দলে নেই। আমি নিজের যত্ন নেই, তারুন্য ধরে রাখার চেষ্টা করি। তাই আমি আদর্শ মা নই। নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিন তিনটা বাচ্চার জন্ম দিয়েও আমি আদর্শ মা নই। আদর্শ মায়ের সংজ্ঞা বদলালে হয়তো আমি আদর্শ মা হতে পারবো। সর্বোপরি সততা ও বিনয় দিয়ে সব জয় করতে চাই , নিজ সন্তান ও সমাজকে ও সেই শিক্ষাই দিতে চাই। যা অর্জন করেছি অনেক বাধা এসেছে.... শুধু সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রেখেছি। জীবনটা অল্পদিনের.... মাথা উচু করে বাচঁতে চাই।
মাহমুদা খানম মিলি।
মহিলা বিষয়ক সম্পাদক
পৌর আওয়ামিলীগ ।
চরফ্যাশন পৌরসভা।
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=871734613583701&id=100022415100979